বৃহস্পতিবার ৩০ এপ্রিল ২০২৬ - ১৩:১০
মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য: ইরানের পাশে দাঁড়ানো

ইরান আজ শুধু একটি দেশ নয়, বরং মুসলিম স্বাতন্ত্র্য ও প্রতিরোধের প্রতীক। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, গুপ্তহত্যা ও আঞ্চলিক উস্কানির মধ্যেও ইরান ইসলামী বিপ্লবের পতাকা উঁচিয়ে রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য কোথায়? সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মাওলানা মাসুম আলী গাজী নাজাফি স্পষ্ট ভাষে বলেছেন, ‘ইরানের পাশে দাঁড়ানো শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি ঈমানি দায়িত্ব।’ হাসান রেজার সঙ্গে একান্ত আলাপে তিনি তুলে ধরেছেন-কেন ইরানকে সমর্থন করা উম্মাহর ঐক্যের প্রশ্ন, কীভাবে নীরবতা জালেমের পক্ষে যাওয়ার নামান্তর, এবং কোন পথে মুসলিম দেশ ও জনগণ কার্যকর সহযোগিতা করতে পারে। বিভক্ত উম্মাহর জন্য এ এক জরুরি বার্তা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: আসসালামু আলাইকুম হুজুর। আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য ধন্যবাদ। প্রথম প্রশ্ন: ইরানের পাশে দাঁড়ানোকে কেন আপনি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য বলে মনে করেন?

মাওলানা মাসুম আলী গাজী নাজাফি: ওয়ালাইকুম আসসালাম। আপনার আগ্রহের জন্য শুকরিয়া। বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট: ইরান ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে শুধু নিজ দেশ নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও প্রতিরোধের বাতিঘর। আজ ইরানের বিরুদ্ধে যা কিছু চক্রান্ত চলছে—অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, গুপ্তহত্যা, মিডিয়া যুদ্ধ, এমনকি সামরিক হুমকি—তা প্রকৃতপক্ষে মুসলিম উম্মাহর স্বাধীন সত্তার বিরুদ্ধে। নবী (সা.) বলেছেন, “মুসলমানরা পরস্পর ভাই; তারা একটি দেহের মতো। দেহের এক অংশ কষ্ট পেলে গোটা দেহই জ্বরে আক্রান্ত হয়।” তাই ইরান যখন কষ্ট পায়, তখন মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য একতাবদ্ধ থাকা, পাশে দাঁড়ানো।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: অনেকে বলে থাকেন, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক মানে শুধু একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক; তা কেন সমগ্র উম্মাহর বিষয় হবে?

মাওলানা মাসুম আলী গাজী নাজাফি: এটা সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। ইরান একটি সাধারণ রাষ্ট্র নয়; এটি ইসলামী বিপ্লবের কেন্দ্র। কুদস দিবস থেকে শুরু করে ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন—সর্বত্র মুসলমানদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে যে কণ্ঠস্বর সবচেয়ে জোরালো ও বলিষ্ঠ, সেটি ইরানের। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “মু’মিনরা পরস্পর ভাই-বোন; তাই তোমাদের ভাইদের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করো” (সূরা আল-হুজুরাত, ১০)। ইরান যখন শত্রুপক্ষের ক্রমাগত আগ্রাসনের মুখে পড়ে, তখন নীরব থাকা মানে জালেমের পক্ষ নেওয়া। তাই এটি শুধু ইরানের ব্যাপার নয়, বরং প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: প্রত্যক্ষ সামরিক সাহায্যের পরিবর্তে মুসলিম দেশগুলো কী কী কার্যকর উপায়ে ইরানের পাশে দাঁড়াতে পারে?

মাওলানা মাসুম আলী গাজী নাজাফি: অনেক উপায় আছে:

১. কূটনৈতিক সমর্থন: আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইরানের পক্ষে কণ্ঠ দেওয়া, নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা।

২. অর্থনৈতিক সহযোগিতা: দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি, তেল ও গ্যাসের বিনিময়, রপ্তানি-আমদানিতে স্বাচ্ছন্দ্য সৃষ্টি।

৩. মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ: ইরানের সত্য চিত্র তুলে ধরা; ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ, ন্যায়পরায়ণতা ও বিজ্ঞানচর্চার প্রচার করা।

৪. আধ্যাত্মিক সমর্থন: মসজিদ, মহল্লা ও গণমাধ্যমে ইরানের জন্য দোয়া এবং জনমত গঠন করা।

৫. প্রযুক্তি ও শিক্ষা বিনিময়: ইরানের সঙ্গে বিমান, ড্রোন, চিকিৎসা প্রযুক্তি, ন্যানো প্রযুক্তি ও পরমাণু বিজ্ঞানের শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিয়ে যৌথ উদ্যোগ।

এগুলো কোনো দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ নয়, বরং ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বাস্তব প্রয়োগ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: এ প্রসঙ্গে কিছু মুসলিম দেশ ইরানের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে—তাদের কী বলা উচিত?

মাওলানা মাসুম আলী গাজী নাজাফি: প্রথমেই বিনয় ও দয়ার সাথে বলব, ঈমানি ভাইবোন, আমরা কি ভুলে গেছি যে ইরান আজও কিবলার প্রথম দিকের দুশমনের চোখে কাঁটার মতো? মার্কিন জায়নবাদী শক্তি ইরানকে দমন করতে পারে বলেই আজ মুসলিম দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলানো হচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষী, যে মুসলিম দেশগুলো আমেরিকার ইশারায় ইরানের বিপক্ষে গিয়েছে, শেষ পর্যন্ত তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুরআনের নির্দেশ, “আল্লাহর রশি সবাই মিলে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো; আর বিভক্ত হয়ো না” (সূরা আলে ইমরান, ১০৩)। তাই আমি ওই দেশগুলোর নেতা ও জনগণের কাছে অনুরোধ করব, পুনর্বিবেচনা করুন; পারস্পরিক বিরোধ ছেড়ে ইসলামী প্রতিরোধের মূল মেরু ইরানের পাশে দাঁড়ান।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: ইরানের পাশে দাঁড়ানো মানে কি ইরানের সরকারের সব নীতি সমর্থন করা অথবা অন্য মুসলিম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে না বলা?

মাওলানা মাসুম আলী গাজী নাজাফি: একদম না। ইসলামী সমর্থন মানে অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং ন্যায়ের ভিত্তিতে সহযোগিতা। ইরানের কিছু নির্দিষ্ট নীতি নিয়ে কোনো মুসলিম যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা করতে পারে, তবে তা হতে হবে সরাসরি, গঠনমূলক, গুপ্ত শক্তির পক্ষপাত ছাড়া। পাশাপাশি, ইরানের পাশে দাঁড়ানোর অর্থ এই নয় যে অন্য মুসলিম দেশের দুর্বলতা বা ভুল আমরা এড়িয়ে যাব। বরং ইসলামী উম্মাহর স্বার্থে আমরা চাইব সব দেশ ন্যায় ও শরিয়তের কাঠামোতে এগোয়। তবে আজ সবচেয়ে বেশি আঘাত আসছে ইরানের ওপর—তাই জরুরি সময়ে কর্তব্য হলো সর্বপ্রথম সেই প্রতিরোধের কেন্দ্রকে রক্ষা করা।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: পরিশেষে মুসলিম জনসাধারণের জন্য আপনার বিশেষ বার্তা কী?

মাওলানা মাসুম আলী গাজী নাজাফি: আমার বার্তা সুস্পষ্ট: জাগো হে মুসলিম উম্মাহ! আরব্য বসন্ত থেকে শুরু করে গাজা, কাশ্মীর, রোহিঙ্গা—সর্বত্র আমরা বিভক্ত হয়েছি বলে শত্রু আমাদের খণ্ড-বিখণ্ডিত করেছে। ইরান এখন শত্রুর মূল টার্গেট। তাই দোয়া কোন কাজে আসে? বরং প্রতিটি মুসলমানকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ইরানের প্রতি সংহতি জানাতে হবে: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সত্য ছড়ানো, বয়কটের তালিকা মানা, সরকারকে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানানো এবং সর্বোপরি নিজেদের মধ্যে শিয়া-সুন্নি সংহতি মজবুত করা। মনে রাখবেন, আজ ইরান রক্ত দিচ্ছে মুসলিম মর্যাদার জন্য; আগামী কাল আমাদের পালা হতে পারে। আল্লাহ বলেন, “আর মু’মিন নর-মু’মিনরা পরস্পর অভিভাবক” (সূরা আত-তাওবা, ৭১)। সুতরাং আজ অভিভাবকত্বের সময়।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: হুজুর, সময় দিয়ে এত মূল্যবান বিশ্লেষণ শেয়ার করার জন্য জাজাকাল্লাহ খাইরান।

মাওলানা মাসুম আলী গাজী নাজাফি: ওয়াফিকুমুল্লাহ। আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ। সংহতি ও প্রার্থনা নিয়ে সংলাপ শেষ করছি। ইনশাআল্লাহ মুসলিম উম্মাহ জাগ্রত হবে, ইরান জয়ী হবে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: হাসান রেজা

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha